Subscribe
চলচ্চিত্র

আমাদের অর্জন, বিয়োজন

আহা! জলের মতো সরল জীবন কি কোনো দিন পাব এই জলজঙ্গলের দেশে? ইটসুরকির হিসাব করতে করতে গেল সারাটা বেলা; ঘরের ঠিকানা তৈরি করতেই পার করলাম সমস্তটা জীবন, এখন কে থাকবে সেই ঘরে? কী তার পরিচয়? ডাকপিয়ন ঠিকানা পেল, মানুষটা পেল না। যাক, অন্তত ভুলে অন্য এক দুয়ারের কাছে উপনীত হয়ে যায়নি! প্রথম কাজটুকু ঘটে গেছে, এবার মানুষটার খোঁজ করার পালা। কোথায় পাব তারে? যিনি এই বাংলার রূপ মুদ্রিত করেছেন রুপালি পর্দায়; ‘আমার সোনার বাংলা...’ বলতে চেয়েছেন, ‘...আমি তোমায় ভালোবাসি’; জীবন থেকে নেয়া এই গল্প যিনি জীবনের থেকে বড় করে তোলেন, তিনি আজ নিখোঁজ। বন্ধু, আবার হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে বলে, এই বাংলার অগুনতি মানুষের চোখে চেয়ে তোমায় আজও খুঁজি। ‘কেন চেয়ে আছো গো মা...’

হ্যাঁ, চেয়ে থাকা মানে অপেক্ষায় থাকা, মানে অন্তর থেকে কিছু চাওয়া। ‘কী চাহ শঙ্খচিল?...’ আমি চাই উড়তে। ডিমের খোলস ভেঙে বেরিয়েছি, শিখতে চাই ডানার ব্যবহার...অনেক আঘাত হূদয়ে জমেছে, তবু আকাশ রচনা করার আকাঙ্ক্ষা মেটেনি। আমি পেয়ে গেছি আমার মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ। হায়, তবু আমি পরাধীন, নিজের কাছে। ইতিহাসের পাতায় স্বপ্নবাজের জন্য নেই কোনো পঙিক্ত, সে অপাঙেক্তয়। তার জায়গা পৌরাণিক গালগল্পে। তোমার অপেক্ষায় চেয়ে আছি—এ খবর জানেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। সন্দেহের চোখে দেখবেন তিনি, তবু তোমাকে চাই। ‘জহির রায়হানের খোঁজ পাওয়া গেছে’—এ রকম একটি সংবাদ শোনার আকাঙ্ক্ষায় পেরিয়ে গেছে অনেক বছর। স্বাধীনতা-উত্তর এই আমার বাংলাদেশে অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যমের সঞ্চরণ ও তার বিস্তার প্রসঙ্গে ভাবতে গিয়ে চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের কথাই প্রথম মনে পড়ে যায়। গত ৪০ বছরে এ দেশের সিনেমা ও টেলিভিশনমাধ্যমে আমাদের কী অর্জন, কী বর্জন, আর কী কী বিসর্জন ঘটল, সেই খতিয়ান দেওয়ার মতো যোগ্যতা আমার নেই; আমি ইতিহাসবেত্তা নই, নই সমালোচকও। এই ক্ষণে, আমি শুধু গত দুই যুগ ধরে সিনেমা ও টেলিভিশনমাধ্যমে ঘটে যাওয়া ঘটনা-দুর্ঘটনা নিয়ে নিজের প্রত্যাশা ও প্র্যাকটিসের নিরিখে কিছু কথামালা হাজির করতে পারি মাত্র।

তবু, কেন আজও জহির রায়হানকে প্রয়োজনীয় বোধ হলো? কারণ কিংবা অকারণ যা-ই হোক, তিনি স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের সিনেমা, সাহিত্যের একজন কর্ণধার শুধু নন, বাংলাদেশের অভ্যুদয়-মুহূর্তের একজন তুমুল সাক্ষী, যার স্বাক্ষর রয়ে গেছে জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০) ও স্টপ জেনোসাইড-এ (১৯৭১)। কেন এবং কীভাবে তিনি নিখোঁজ হলেন, লেট দেয়ার বি লাইট সম্পূর্ণ করতে পারলে এ দেশের সিনেমার কী এমন সমৃদ্ধি ঘটত, জাগো হুয়া সাভেরা (১৯৫৯), কখনো আসেনি (১৯৬১), সূর্যস্নান (১৯৬২), কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩), সুতরাং (১৯৬৪), নদী ও নারীর (১৯৬৫) ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সিনেমা বিশ্বের দরবারে কোথায় গিয়ে পৌঁছাতে পারত, সে বিষয়ে জল্পনা-কল্পনাই শুধু করতে পারি।
’৭১-পরবর্তী যে ছবিগুলো আমরা পাই, তা যতটা না সিনেমা, তার চেয়েও বেশি মুক্তিযুদ্ধের হ্যাঙওভার। যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধপরবর্তী স্বাধীন দেশের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ওরা এগারো জন (১৯৭২), আবার তোরা মানুষ হ (১৯৭৩) তার নিকৃষ্ট উদাহরণ। কাছাকাছি সময় নির্মিত হলো ঢিসুম ঢিসুম মারদাঙ্গা মিষ্টি প্রেমের সিনেমা রঙবাজ (১৯৭৩), পরবর্তী সময় আরও অনেক রঙবাজই দেখা গেছে আমাদের সিনেমায়। জহির রায়হানের মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্মিতির সহযোদ্ধা আলমগীর কবির নির্মাণ করলেন ধীরে বহে মেঘনা ও সীমানা পেরিয়ে। কিন্তু এ ছবি দুটি একদিকে যেমন নাগরিক স্মার্টনেসের স্মারক, তেমনি আবার ক্লিশে মধ্যবিত্ত-মানসিকতার ঘেরাটোপে বন্দী। সিনেমায় স্বাধীনতা-পরবর্তী উল্লেখযোগ্য অর্জন ঋত্বিক কুমার ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩), রাজেন তরফদারের পালঙ্ক (১৯৭৪?) মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলীর সূর্য দীঘল বাড়ি (১৯৭৯)। এ ছাড়া নারায়ণ ঘোষ মিতার নয়নমণি (১৯৭৬), আমজাদ হোসেনের গোলাপি এখন ট্রেনে (১৯৭৮), আবদুল্লাহ আল-মামুনের সারেং বৌ (১৯৭৮) দর্শকমনে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। কিন্তু আমরা দেখলাম, স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশে সিনেমায় যে উত্থানপর্ব সূচিত হয়েছিল, তা যেন ক্রমশ ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছে। এই বোধ থেকে আশির দশকের চলচ্চিত্র সংসদকর্মী ও ফিল্ম ইনস্টিটিউটের, বিশেষ করে ভারতের পুনা থেকে পড়ে আসা কিছু নতুন চলচ্চিত্রকার এ দেশের রুপালি ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। বাদল রহমানের এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী (১৯৮০) ও সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকীর ঘুড্ডি (১৯৮০) এর মধ্যে অন্যতম। এর কিছুকাল পরই রেগুলার ইন্ডাস্ট্রির বাইরে বিকল্প ধারার সিনেমা নির্মাণ ও প্রদর্শনের নিমিত্তে তরুণতর নির্মাতা ও নির্মাণকর্মীদের সংগঠন বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের আবির্ভাব ঘটে। এই প্ল্যাটফর্ম থেকে আমরা পাই মোরশেদুল ইসলামের আগামী (১৯৮৫), চাকা (১৯৮৯), তানভীর মোকাম্মেলের হুলিয়া (১৯৮৫), নদীর নাম মধুমতি (১৯৯৪), তারেক মাসুদের আদম সুরত (১৯৮৯), মুক্তির গান (১৯৯৫), মাটির ময়না (?) ইত্যাদি ইত্যাদি। তোজাম্মেল হক বকুলের রেকর্ড সৃষ্টিকারী ব্যবসা-সফল ছবি বেদের মেয়ে জোসনা (১৯৮৯) ঢাকার শাহাবাগস্থ পাবলিক লাইব্রেরি-কেন্দ্রিক ১৬ মিলিমিটারে নির্মিত ও প্রদর্শিত বিকল্পধারার ছবিগুলোকে একটি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। মধ্য-আশিতে রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের সংস্কৃতিপ্রবণ বুদ্ধিজীবীদের অনুমোদন পেলেও তা দেশের মূল দর্শকশ্রেণীর অগোচরেই থেকে যায়। এদিকে এফডিসি নির্মিত সিনেমাগুলো যৌনতা ও সন্ত্রাসের রগরগে রিপ্রেজেন্টেশনের কারণে দর্শক হারাতে শুরু করে। অশ্লীলতা ও হলের অসুস্থ পরিবেশকে দায়ী করে যে মধ্যবিত্ত দর্শক হল ছেড়েছেন, তাঁরাই কিন্তু ঘরে বসে ভিসিপিতে দেখেছেন হিন্দি ছবির নাচ-গান, হলিউডের অ্যাকশনধর্মী প্রেমকাহিনিভিত্তিক সিনেমা। আমি নিজেও তার সাক্ষী। ভিসিআরের যুগে আমরা বন্ধুরা যখন একত্রে ছবি দেখতে বসতাম, তার প্রথম ছবিটি থাকত রোমান্টিক হিন্দি ছবি, দ্বিতীয়টি হলিউড বা ব্রুসলির অ্যাকশন ছবি, আর শেষ হতো এক্সরেটেড ছবি দিয়ে। তারও বেশ কিছুকাল বাদে বাংলাদেশে স্যাটেলাইট টেলিভিশন আবির্ভূত হয়েছে এবং তারা রেগুলার ইন্ডাস্ট্রির বাইরে সিনেমা নির্মাণের প্রকল্প হাজির করেছে। হুমায়ূন আহমেদের শঙ্খনীল কারাগার (১৯৯৪), আগুনের পরশমনি (১৯৯৬), শ্যামল ছায়া (২০০৪), মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ব্যাচেলর (১৯৯৪), থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার (২০০৯), আবু সায়ীদের কীত্তনখোলা (২০০০), শঙ্খনাদ (২০০৪), নিরন্তর (২০০৬), সামিয়া জামানের রানি কুঠির বাকি ইতিহাস (২০০৬), তৌকির আহমেদের জয়যাত্রা (২০০৪) এবং বেদের মেয়ে জোসনার পর গিয়াসউদ্দিন সেলিমের মনপুরা (২০০৯) সব শ্রেণীর দর্শককে বাংলা সিনেমার প্রতি কৌতূহলী করেছে, হলে টেনে এনেছে। কিন্তু মনপুরাও এ দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়েই থাকবে। এফডিসি-কেন্দ্রিক সিনেমা এখন কেবল ‘এক-নায়ক’নির্ভর নির্মাণ-প্রক্রিয়া মাত্র। স্বাধীনতাপূর্ব বাংলা চলচ্চিত্র সেই সাবালকত্ব অর্জনের সম্ভাবনা দেখিয়েছিল, যার ইতি ঘটেছে স্বাধীনতার পরপর।

স্বাধীন বাংলার ঠিকানাটা তো পেলাম। লাল-সবুজের স্ট্যাম্প মুদ্রিত আছে নির্মাতা, দর্শক—সবার হূদয়ে। কিন্তু খাম খুললেই কোরা কাগজ! নদীর সহজ সঞ্চরণের গতিপথ চোরাবালিতে শুষে নিয়েছে। পথিক হারিয়েছে তার পথ, বেপথু দিশেহারা, ঘরের ঠিকানা খুঁজে ফেরা শিশুর মতোই আমার দেশের সিনেমা। সেই কবে, কোন কালে ১৯৬১ সালে রায়হান কখনো আসেনি, সেকি আসবে কখনো? তাঁর প্রত্যাশায় আমরা থাকি প্রতি ৩০ জানুয়ারি। এই কাচের দেয়াল ভাঙবে বলে কত শত তরুণ নির্মাতা হাত মকশো করে যাচ্ছে। দেয়াল ভেঙে ফেলার এই আকাঙ্ক্ষায় তারা না আবার টুকরো কাচে নিজেদের ক্ষতবিক্ষত করে। তবু প্রত্যাশার শেষ নেই। কারণ, এখন স্বাধীন সূর্য ওঠে এই বাংলায়। নতুন সিনেমার নির্মাতাদের স্বাগতম।
সিনেমা কেবলই সিনেমা নয়, জীবনযাপনের আইকনও। আজকের পাঠক সহজে বুঝবেন, যদি বলি, সিনেমা প্যাশন ও ফ্যাশন। কিন্তু আজকের ফ্যাশন টেলিভিশন, যা ছিল কাল রুপালি পর্দায় প্রস্ফুটিত ফুল, আজ তা ফুলদানিতে বন্দী। সঙ্গী তার কম্পিউটার, ইন্টারনেট, পাইরেটেড ডিভিডি, ফেসবুক, পাসপোর্ট-ভিসা বিদেশ ভ্রমণের।

ঢাকা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্ট থেকে বাংলাদেশের টেলিভিশনের যাত্রা শুরু। কতটা ইম্প্রুভ করল স্বাধীনতার পর, চলুন তার খোঁজ করি। যে রমণী মুখরা, তাকে বশীকরণে এই বোকা বাক্স যথেষ্টই সফলকাম হয়েছে। রামপুরার টেলিভিশন ভবন থেকে সম্প্রচারিত একটি সংশপ্তক, অয়োময়, এইসব দিনরাত্রি, আমি তুমি সে, ঢাকায় থাকি—এসব নাটকে বাংলার মানুষ নিজেদের জীবনে আশা-ভালোবাসা, প্রেম ও নিরাশা আপন করে দেখতে পেয়েছে।
প্রায় এক যুগ আগে বিটিভির পাশাপাশি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর যাত্রা শুরু হয়েছে। এ চ্যানেলগুলোর মধ্যে একুশে টেলিভিশন একটি যুগান্তকারী ভূমিকা সূচিত করে। স্বপ্নবাজ নবীন নির্মাতাদের সুযোগ ঘটিয়ে দেয় সময়ের চাহিদা মোকাবিলায়। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখি সাইদুল আনাম টুটুল, সালাহউদ্দিন লাভলু, গিয়াসউদ্দিন সেলিম, গাজী রাকায়েত, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও আফসানা মিমির মতো নির্মাতাদের। তাঁদের নাটকে এ দেশের জনজীবন মুদ্রিত হতে দেখা গেল নতুন ভঙ্গিমায় এবং দর্শকেরাও নতুনত্বের স্বাদ পেয়ে ভারতীয় সিরিয়াল থেকে নিজঘরে মুখ ফেরালেন। আচমকা একুশে টিভি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একটি বিকাশমান টিভি ইন্ডাস্ট্রি আবার বিভ্রান্তির পথে পা বাড়াল। টিভি চ্যানেল পরিচালনার জন্য ন্যূনতম ধারণা কিংবা অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে আর অর্থনৈতিক লাভের আশায় জিম্মি হয়ে গেল বাংলাদেশের টেলিভিশন মিডিয়া। এ দেশে টেলিভিশনে সম্প্র্রচারিত এক ঘণ্টার নাটক পৃথিবীতে একটি বিরল ঘটনা এবং পরিতাপের বিষয় এই যে, কেবল এ দেশেই টেলিভিশন তার সম্প্রচার বিপুলভাবে কণ্টকিত করতে পারে বিজ্ঞাপন দিয়ে। আশ্চর্য ব্যাপারটি হলো প্রযোজক, নির্মাতা ও কলাকুশলী তাঁদের সময়, শৈল্পিক আকাঙ্ক্ষা ও পেশাদারি প্রয়োজনে যে প্রোডাক্ট নির্মাণ করেন, সেটি বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রোডাক্টের ভিড়ে চাপা পড়ে যাচ্ছে। টেলিভিশন চ্যানেল চায় বিজ্ঞাপনদাতার মুখরক্ষা করতে, নির্মাতা চান টিভি-অধিকর্তার; আর শিল্পী-কলাকুশলী চান কেবল তাঁর সময়ের অর্থমূল্য। পাঠক, আপনি একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, সব কটি চ্যানেলে একই নির্মাতার নাটকে অভিনয় করে যাচ্ছেন একই শিল্পী এবং দুটি চ্যানেলের নাটক আলাদা করাও দুষ্কর, যেন একটি অন্যটির নকল, ফটোকপি মাত্র। এর ব্যতিক্রম হিসেবে যে দু-একটি প্রণোদনা হাজির হয়, তাও ভেসে যায় মিডিয়াবাজির তোড়ে। বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির দুরবস্থার কথা যতটা কাগজে-কলমে মুদ্রিত হয়, ঠিক ততটা হয় না টেলিভিশন নিয়ে। কেন? কারণ টেলিভিশন পুরোপুরি বিজ্ঞাপননির্ভর এবং পত্রিকাগুলোও আংশিকভাবে। অপরিণামদর্শী টিভি ব্যবস্থাপনা যদি তার দর্শককে ভুলে বিজ্ঞাপনদাতার পদসেবাই করে যান, তবে দর্শক অন্যত্র মুখ ফিরিয়ে নেবেন বৈকি। হতাশার কথা হলো, দর্শক ইতোমধ্যেই ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে ফের ভারতীয় সিরিয়ালে মন দিয়েছেন। এদিকে দিনকে দিন নির্মাণ-বাজেট সংকুচিত হয়ে আসছে, অথচ বাড়ছে নির্মাণব্যয়, আর কলাকুশলীর সম্মানী। একজন নির্মাতাকে কোনোভাবে টিকে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে কম্প্রোমাইজ করতে হচ্ছে নির্মিতির সঙ্গে। টিভি চ্যানেলের বড় কর্তার অনুমোদনের বাইরে প্রডিউসারও কোনো রিস্ক নিতে পারছেন না, পারছেন না নতুন কোনো নিরীক্ষাকে সুযোগ দিতে। ফলে নির্মাণ-দলকে নির্ভর করতে হচ্ছে ‘শিওর শট’-এর ওপর। কিন্তু আমরা সবাই ভুলে গেছি, দর্শকের হাতে আছে শতাধিক দেশি-বিদেশি চ্যানেলের রিমোর্ট বাটন। কিন্তু হায়! আমি তো নিরুপায়। সেই থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোর করেই দিনগুজরান করতে হবে। আজ যাঁরা বিজ্ঞাপনদাতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতাধরের অনুগ্রহে তাঁর চ্যানেল ব্যবসাকে টিকিয়ে রেখেছেন, তাও একদিন মুখ থুবড়ে পড়বে। এটা কি তাঁরা একবারও ভেবে দেখেছেন? দর্শকের মনোজগতের খোঁজ-খবর না নিয়ে এলেবেলেভাবে ব্যবসার ফন্দিফিকিরি এই ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনবে। এত সব হতাশার বয়ানের পরও যতটুকু বুঝি, এখনই সময় পুনর্বিবেচনার। প্রয়োজন আলোচনা, সমালোচনার। প্রয়োজন সংকট উত্তরণের উপায় খুঁজে বের করার। কে করবেন, করবেন টেলিভিশনের কর্তাব্যক্তি, বিজ্ঞাপনদাতা, কলাকুশলী, সাংবাদিক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা। এখনই খোলা মনে পারস্পরিক বোঝাপড়া করা জরুরি। নইলে স্যাটেলাইট টিভির যে সম্ভাবনা ইটিভি যুগে সূচনা হয়েছিল, তা নস্যাৎ হয়ে যাবে অচিরেই। অসংখ্য টিভি চ্যানেল চালু করার অনুমোদন দিয়ে তাকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না, বরং ভয়াবহতাকেই ত্বরান্বিত করবে। দেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির ৪০ বছরের অর্জন বিয়োজনের এই নিরিখটুকু এখনই বাঁধবার দরকার আছে। বাঁধ ভেঙে গেলে ভেসে যাবে আমাদের সমস্ত অর্জন।

পাঠক, এত সব বিপর্যয়ের সংবাদ ও মনখারাপ করা অনুভূতিমালা আপনার কাঁধে চাপিয়ে দিতে গিয়ে আমার নিজের মনটাও ভারী হয়ে আসে। উপায় কে বাতলাবে? জহিরের খোঁজ পেলে কাইন্ডলি আমাকে জানাবেন।

Copyright © 2019 All right ® reserverd by Nurul Alam Atique Art: Sabyasachi Mistry, Design: Rainy, Arrangement: Nahidur Rahim Chowdhury Ananda, Developed by eMythMakers.com